ধর্মীয় দলে নারীদের যৌন দাসত্ব: বাংলাদেশ কেস
পর্ব -১
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী নামক রাজনৈতিক দলে যোগদানকারী একজন ইসলাম পালনকারী নারীর অন্যতম প্রধান ভূমিকা হতে পারে তার সহযোগী পুরুষ সদস্যদের—যাদের মুমিন ভাই বলা হয়—”যৌন কষ্ট” দূরীকরণে সহায়তা প্রদান।
হ্যাঁ, আপনি ভুল পড়েননি।
গত কয়েক দশক ধরে, ফাটল দিয়ে গল্পগুলো বেরিয়ে এসেছে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্ধুদের মধ্যে ফিসফিস করে বলা কথা, নিকাব এবং হিজাবের আড়াল থেকে টুকটাক শব্দ ফাঁস হয়েছে। একটু একটু করে। সে সব থেকে স্পষ্ট উন্মোচিত হয় এ সত্য: জামায়াতে ইসলাম তার বাইরের সদগুণের মুখোশ এবং আমীরের মিষ্টি হাসির তলায় অন্যান্য অভ্যাস লুকিয়ে রেখেছে।
একটি চিঠি নীরবে উচ্চারিত অংশটি উন্মোচিত করছে এই বাস্তবতা—পবিত্র ওয়াজের আড়ালে, ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের আন্দোরনের ওয়াসিলায় জামায়াতের নারী শাখা ইসলামী ছাত্রী সংস্থায় যোগদানকারী নারীদের জন্য এক ধরণের যৌন দাসত্বের ভূমিকা রয়েছে।
১. প্রকাশিত তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ চিঠি
মানবাধিকার কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সংগঠনের সংস্কৃতি এবং নারীদের প্রতি আচরণ সম্পর্কিত ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নথি। অন্তত একটি যোগাযোগে এমন একটি সাংগঠনিক আচরণের ধরণ প্রকাশ পেয়েছে যা শৃঙ্খলার ছদ্মবেশে লিঙ্গ-ভিত্তিক যৌন নির্যাতনকে বৈধতা দেয়।
৫ অক্টোবর, ২০২০ তারিখে জামায়াতের আমীর ড. শফিকুর রহমানের স্বাক্ষরিত একটি গোপনীয় চিঠি, দলের নারী এবং পুরুষ শাখার মধ্যে প্রচারিত হয়েছিল বলে ১. প্রকাশিত তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ চিঠিতে জানা গেছে। চিঠিতে আমীর সারা দেশে ধর্মীয় ভাইদের দ্বারা সংঘটিত ধর্ষণ এবং বলাৎকার জাতীয় নির্যাতনের ঘটনাগুলো স্বীকার ও অভ্যন্তরীণ সমাধান প্রস্তাব করেছেন।
এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায় যে জামায়াতে ইসলামী দলটিতে নারীদের যৌন নির্যাতনকে নিন্দা বা আইনগতভাবে সমাধানের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যৌনতা ব্যাবস্থাপনা করা হয়। নৈতিক এবং আইনি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ ধরণের নির্দেশনা গুরুতর উদ্বেগের কারণ।
২. নির্দেশনার ভাষা এবং প্রভাব বিশ্লেষণ
উল্লেখিত চিঠিটি নিবিড়ভাবে পাঠ করলে জানা যায় যে জামায়াতে ইসলামী তার সদস্যদের মধ্যে ধর্ষণ এবং বলাৎকারের মতো নির্যাতনের ঘটনাগুলো পরোক্ষভাবে স্বীকার করে ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়। সদস্যদের যৌন আচরণকে বিচ্ছিন্ন অপকর্ম হিসেবে না দেখে, এটি অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাবস্থাপনার বিষয়টিই দলটির প্রদান ব্যক্তিদের কাছে অগ্রগণ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই চিঠিতে এ জাতীয় অপরাধে আইনি জবাবদিহিতার কথা কোথাও উচ্চারিত হয় নি।
চিঠিতে “ধর্ষণ এবং বলাৎকারের পুণরাবৃত্তি” শব্দ চারটি বিশেষ ভাব প্রকাশক। বাক্যটি এই কাজগুলোকে সরাসরি নিন্দা জানায় না। এ জাতীয় শব্দবিন্যাস এই অপরাধগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে চিত্রিত করে—যা নৈতিক বা আইনি সংকটের চেয়ে ঘটনা সমাজে প্রচারিত হলে দলের জন্য ”ঝুঁকি” তৈরী হবে বোঝাচ্ছে। অর্থাৎ এসব ঘটনা “জনসংযোগ ঝুঁক “ হিসেবে এখানে উপস্থাপিত হয়েছে।
৩.সাংগঠনিক জনশক্তির আচরণ এবং সংযম ব্যাবস্থাপনা
চিঠিতে আরও প্রকাশ হয়েছে যে “সাংগঠনিক জনশক্তির আচরণ এবং সংযম” নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
পাশাপাশি চিঠি থেকে জানা যায়, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব—বিশেষ করে মজলিসে শূরাই—সদস্যদের মধ্যে যৌন শৃঙ্খলা তদারকির দায়িত্ব পালন করে থাকে।
যৌন আচরণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দলের শীর্ষ বোর্ড থেকে এ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে দলটির বা তাদের সাথে ইসলামী রাষ্ট্র আন্দোলনে জড়িত অন্যান্য দলের বা গোষ্ঠীর পুরুষ সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত যৌন-সন্ত্রাসের শিকারদের সুরক্ষা বা এ জাতীয় অপরাধীর বিচার নিয়ে চিন্তিত নয়। বরং দলের ভেতরের খবর বাইরে গিয়ে যেন দলীয় সুনামের ক্ষতি না হয় তা নিশ্চিত করতে দরের সুনাম নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেওয়া হয়। উল্লিখিত চিঠির বয়ান ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর আদর্শিক লক্ষ্যে যৌনতা ফাঁস হবার মতো ব্যাঘাত কমানোর নীতিকে স্পষ্ট করে।
উল্লেখযোগ্য যে, চিঠিতে উল্লিখিত সিদ্ধান্তগুলো মজলিসে শূরার সুপারিশের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল। এটি জামায়াতের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সংস্থা।
একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক বোর্ড এভাবে সদস্যদের ব্যক্তিগত যৌন আচরণে হস্তক্ষেপ করবে তা গুরুতর নৈতিক এবং আইনি প্রশ্ন উত্থাপন করে। চিঠিতে যৌন সন্ত্রাসের শিকার নারী ও শিশু বা আপামর জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য কোনো স্পষ্ট উদ্বেগ নেই। পরিবর্তে, এই তথ্য যাতে মিডিয়ার হাতে না পড়ে তা নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং বলাতে হয় উল্লেখিত চিঠিটি সংস্কারের নীতির চেয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি রূপকে উপস্থাপন ধরে। যে নীতি জানাচ্ছে যৌন নির্যাতনকে জামায়াত নৈতিক ব্যর্থতা বা সামাজিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না, বরং প্রয়োজনের ফলে উদ্ভূত এক ধরণের আচরণ হিসেবে বিবেচনা করে, এবং দলটি এসব বিষয় সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গোপনে ম্যানেজ করে।
ফলস্বরূপ, চিঠিটি পুরুষ সদস্যদের যৌন তাড়না নিয়ন্ত্রণ না করে, জামায়াতের জাতীয় নেটওয়ার্কের ইসলামী গোষ্ঠী, মাদ্রাসা এবং মসজিদের মধ্যে নারী সদস্য এবং ছেলে-মেয়েদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ না করে, পুরুষ শ্রমশক্তি সংরক্ষণের একটি জামায়াতী ইসলামী কাঠামো প্রস্তাব করে। কাঠামোটি পরে তুলে ধরা হচ্ছে।
৪. আইনি দৃষ্টিকোণ
আসুন এই চিঠির নির্দেশনাগুলো আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করি।
৫ আগস্ট, ২০২৪ পর্যন্ত, বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণ, বলাৎকার এবং যৌন জবরদস্তি গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে কার্যরত যে কোনো রাজনৈতিক দলের এই আইনি এবং নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করে নিজেদের সম্মান ও মর্যাদ বজায় রাখার দায়িত্ব রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, জামায়াতে ইসলামীর এই লিখিত নির্দেশনা জাতীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতা থেকে বিচ্যুতি নির্দেশ করে। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে যে অন্তর্বর্তী সরকার—সংস্কারের ছদ্মবেশে ও জামায়াত এবং তাদের সহায়ক দল বিএনপির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে—নারী এবং শিশুদের জন্য বিদ্যমান আইনি সুরক্ষাকে দুর্বল করার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতায় পুনরুত্থানকে নীরবে সমর্থন করার পর তাদের এ জাতীয় অভ্যন্তরীন অভ্যাস চরমপন্থী ইসলামিক আচার আচরণের আভাস দেয়।
আগেই উল্লেখ করা হযেছে যে, আইনি জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা বা নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষায় বিনিয়োগের পরিবর্তে, চিঠিটি একটি অভ্যন্তরীণ “শৃঙ্খলা” ব্যবস্থার রূপরেখা দেয়। এই শৃঙ্ক্ষলার রূপটি কেমন?
এটি এমন এক কাঠামো যা আদালতকে এড়িয়ে ইসলামের চরম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ব্যক্তি-নিয়ন্ত্রণের ছকটি প্রকাশ করে। একে বলা যায় এক ধরণের সমান্তরাল সামাজিক ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা নারী ও শিশুদের ওপর পুরুষের যৌন অপরাধ গোপন করে। জামায়াতের নির্দেশনা নারী ও শিশুদের যৌন নির্যাতনের সাংগঠনিক জটিলতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধরণ প্রকাশ করে।
ধরে নেয়া যাক, ধর্ষণ ও বলাৎকার জাতীয় নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তি জামায়াতে ইসলামীর আনুষ্ঠানিক সদস্য নন। কিন্তু দলটি বাংলাদেশের সব ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমে উদ্যোগী গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের সাথে আদর্শিক ভ্রাতৃত্বের বোধ নিয়ে কাজ করে। জামায়াতের শূরার তাদের ওপর প্রভাব রয়েছে। বৃহত্তর উম্মাহের ভাই হিসেবে সংযুক্ত বিধায় জামায়াতের রাজনৈতিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সরাসরি বা সখ্যতার মাধ্যমেতারা সবাই সংযুক্ত।
তারপরও দেশব্যাপী গত কয়েক দশকের এ জাতীয় নির্যাতনের শনৈঃ শনৈঃ বৃদ্ধি ও ধারাবাহিক চলতে থাকা প্রমাণ করে যে উল্লিখিত চিঠিতে বর্ণিত অভ্যন্তরীণ “শৃঙ্ক্ষলা প্রক্রিয়া” বৃহত্তর সমাজের নারী, বালক ও বালিকা এবং শিশুদের ক্ষতি প্রতিরোধে কোনও ভুমিকা রাখেনি। বরং এটি পুরুষ যৌনতার শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দলে প্রচলিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তাকে আড়ালে তা পর্দা হিসেবে কাজ করেছে।
৫. সাংগঠনিক জনশক্তির সংরক্ষণ ও অভ্যন্তরীণ প্রতিকার
উল্লেখিত অপরাধে জামায়াতের সদস্যগণ জড়িত এমন খবর যেন বাইরে গিয়ে দলের ক্ষতি না করে, সে উদ্দেশ্যে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দেশনা এক ধরণের অভ্যন্তরীণ প্রতিকার প্রস্তাব করে।
এ প্রস্তাবের দুটো দিক: (১) ছোট ছোট মেয়ে এবং ছেলে ও নারীদের যৌন নির্যাতনে যে ইসলামী সদস্যগণ জড়িয়ে যায় তাদের যৌনতা যেন সীমার মধ্যে রাখা, এবং (২) নারী সদস্যদের আনুগত্য ও সমর্থনের মাধ্যমে পুরুষ যৌনতা ব্যবস্থাপনা করা।
বিশদ বিবরণ উন্মোচনের আগে, এই পরামর্শের পেছনের সংস্থাটি বোঝা জরুরি।
মজলিসে শূরা, জামায়াতের অভ্যন্তরীণ পরিষদ, সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা, যার প্রতিনিধিদের ইসলাম ধর্ম বিষয়েোন্য ইসলামী দেশের শূরার সাথে বোঝাপড়া রয়েছে। এই ছায়া বোর্ডটির সুপারিশ যে কোনো ইসলামী রাষ্ট্রে উদ্বেগজনক নৈতিক নিয়ম কানুনের জন্ম দিয়ে থাকে।
ঐতিহ্যগতভাবে, শূরা ইসলামী শাসনব্যবস্থায় পরামর্শক পরিষদ হিসেবে কাজ করে, আঞ্চলিক স্বার্থ পরিচালনা করে এবং কৌশলগত, মতবাদভিত্তিক এবং অপারেশনাল বিষয় তদারকি করে। জামায়াতের শূরা, কমবেশী প্রায় ৩০ জন রুকন-স্তরের সদস্য নিয়ে গঠিত। এরা দেশ, সমাজ ও দল পরিচালনার সমস্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করে, যার মধ্যে যৌন শৃঙ্খলা ও রয়েছে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত অন্যান্য ইসলামী দল—যেমন হেফাজতে ইসলাম, জাকের পার্টি, ইসলামী ঐক্য জোট, এবং খেলাফত মজলিস—আলাদাভাবে কাজ করে তবে জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক সম্পর্কে যুক্ত। পর্যবেক্ষকদের মতে তার একসঙ্গে “ইসলামী রাষ্ট্র আন্দোলন” সংগঠিত করে। তারা ব্লাসফেমি এবং ইসলামী আইনের উপর সাধারণ বোঝাপড়া নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশকে ‘তাগুতি রাষ্ট্র’ বলে এরা অভিহিত করে ও তা ব্যাপক প্রচার করে।
৬. নির্দেশনার সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
আজকের রাজনৈতিক জলবায়ুতে জামায়াতের এই অভ্যন্তরীণ নির্দেশনার অর্থ কী?
চিঠির কাঠামো এবং সুর থেকে বোঝা যায় যে, জামায়াত দেশে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ক্রমে সোচ্চার হওয়া যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ক্রমবর্ধমান ইমেজ-সংকট পরিচালনার লক্ষ্যে, দলের পুরুষ এবং নারী সদস্যদের জন্য স্পষ্ট বায়োলজিকেন্দ্রিক ভূমিকা নির্ধারণ করে।
চিঠির একনম্বর নির্দেশনা বলে:
“বর্তমানে সারা দেশে ধর্ষণ ও বলাৎকার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা এবং সমালোচনা চলছে। ভিন্ দেশী একটি দেশের ইশারায় পরিচালিত এজেন্ট মিডিয়া জামায়াত এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোকে ফাঁদে ফেলার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।”
নিজেদের সদস্যদের অপকর্ম স্বীকার না করে, দলটি জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের উদ্বেগকে বিদেশী-সমর্থিত ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করে। এই নির্দেশনাকে ব্যাপকভাবে ভারতের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবেই ব্যাখ্যা করা যায়। যা ভারতের প্রতি জামায়াতের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ ও শত্রুতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে আদর্শিক সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে।
যে কারণে ধর্ষণ ও বলাৎকারের সংবাদ ও তাতে জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশকে জামায়াত নিজেদের নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে না নিয়ে, রাজনৈতিক নাশকতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
পর্ব - ২
৫. নারীর প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন ও দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া
২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে, বাংলাদেশে যৌন নির্যাতনের খবর, বিশেষ করে মাদ্রাসায়,অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের চাপের মুখে জামায়াতের শূরা বোর্ড এবং আমীর ড. শফিকুর রহমান একটি সংক্ষিপ্ত অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা জারী করেছেন যাতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নির্দেশনা রয়েছে যার প্রারম্ভের কথা আর্টিকেলের প্রথম পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, তৃতীয় ও চতুর্থ নির্দেশনাটি নিচে উল্লেখিত হলো।
“৩. প্রয়োজনের কারণে, ছাত্রী শাখার বোনদের মুত‘আহ বিবাহের মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় ভাইদের সেবা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
“৪. কোনো বিতর্কে জড়িয়ে না পড়ে আমাদের জনশক্তি রক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।”
এই নির্দেশনাদ্বয় থেকে স্পষ্ট হয় পুরুষ সদস্যদের যৌনতা ব্যবাস্থাপনার জন্য মুত‘আহ বিবাহের মাধ্যমে দলীয় পুরুষদের সেবায় নিয়োজিত হতে ছাত্রী সদস্যদের নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হচ্ছে ।
মুত‘আহ সুন্নি ফিকহের অধীন কোনো ধর্মীয় অনুশীলন নয়। জামায়াতের নিজস্ব নিয়মরূপে এটা মান্য করার বিধান দিয়েছে। এতে দলীয় রাজনীতিতে কিছু সুবিধা হয়।
দলীয় পুরুষদের যৌনতা ব্যাবস্থাপনার দায়িত্ব এভাবে দলটি তার নারীদের উপর চাপিয়েছে। নারীরা পুরুষদের যৌন কেলেঙ্কারির গুণাহ শোষণ করবে ও কৌশলে ভিন্নমত দমনে সাহায্য করবে, গণতান্ত্রিক সমাজের সার্ভেলেন্স এড়াতে সহায়ক হবে এবং তাদের ইসলামী ভাইদের সেবা করে পূণ্য হাসিল করবে, এমন প্রত্যাশাই উপরের দুটো নির্দেশনায় প্রকিাশিত হয়েছে।
৮. এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা অসঙ্গত নয় যে জামায়াত এ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার নারী সদস্যদের—হোক তারা বিবাহিত বা অবিবাহিত, নিয়ম মোতাবেক তাদের আনুগত্য যৌনদাসীর আনুগত্যে রূপ নিতে পারে। তারা দলের সেভিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পুরুষ সদস্যদের দ্বারা মেয়ে শিশু ও বালক-বালিকার ধর্ষন এবং বলাৎকার জাতীয় অপকর্ম যেন মহামারীর মতো পত্রিকার পাতায় উঠে না আসে সে লক্ষ্যে এসব বাফার হিসেবে নারী সদস্যদের শরীরকে ব্যবহার করা হয়।
৬.জামায়াতের ধর্মীয় ঢালের আড়ালে নির্যাতন ও দায়মুক্তির বিস্তার কতদূর?
মসজিদের মিম্বর এবং মাদ্রাসার ছাত্রাবাসের সাথে যুক্ত যৌন সহিংসতা বাংলাদেশে নতুন নয়। সেখানে এসব বিরতিহীন ঘটে চলেছে। বিগত দু’ দশকে এসব এত বেড়েছে যে খবর না করে নিরব থাকাটা গণ মাধ্যমকেও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। কারণ নারীসমাজ ও নারীবাদী গোষ্ঠীগুলো এর বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগে থাকায় কোনও কোনও ঘটনা তারা প্রতিবেদন করতে নৈতিকভাবে বাধ্য হয়।
শুরু থেকেই জামায়াত দলীয় সদস্যদের যাবতীয় দুনিয়াবি অপরাধ অস্বীকার ও সে সবের দায়ভার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কাঁধে চাপিয়ে দেবার রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে এসেছে। শুধুমাত্র ১৯৭১ সালের গণহত্যার অপরাধই নয়, ইসলামিস্টদের ধর্মীয় দূর্গের অভ্যন্তরে চলমান অন্যান্য নির্যাতন নারীর ওপর ঘটে, সে সব অপরাধের অপরাধীকেও দলটি আড়াল করেছে।
মাদ্রাসায় শিশুদের, যৌন সন্ত্রাস এখন আর কোনো ফিসফিসিয়ে বলার মতো বিষয় নয়—এ সব অপরাধ নৃশংস ফ্রিকোয়েন্সিতে পুণরাবৃত্ত হচ্ছে। আইন শৃঙ্ক্ষলার শূণ্যতায় বিগত এক বছরে এসব সন্ত্রাসের পরিণতিতে যেখানে সেখানে তরুণদের লাশ তো পড়ে থাকছেই ধর্ষণ ও বলাৎকারের শিকার শিশুদের লাশও মিলছে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম-এর বক্তব্য থেকে জানা গেছে এমন ঘটনা অনেক হচ্ছে, তবে তা জানা যাচ্ছে কম। এখন দেশের বৃ সঙ্কট নি জাাময়াত বি এনপির ভয়ে যখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই খবর হচ্ছে না, তখন কে মাদ্রাসা নিয়ে কথা বলার সাহস করবে? পূর্বেও কেউ মারা গেলে বা নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে খবর বেরিয়ে এলেই শুধু দু একটি পত্রিকা তা প্রকাশ করতো।
বিগত দশকে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার মতো কয়েকটি ঘটনা দেশব্যাপী প্রকাশ পেয়েছিল। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক:
১. আল আমিন নামক শিক্ষক বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসায় ১২ জন ছাত্রকে বলাৎকার করে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় তার এ অপকর্ম অপ্রকাশিত থাকে।
২. আবুল খায়ের বেলালী, মা হাওয়া কওমি মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে আটটি মেয়েকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ছিল।
৩. ইসরাত হোসেন, মদিনাতুল দারুল উলুম এর শিক্ষক। আট বছরের একটি মেয়েকে ধর্ষণের জন্য তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
৪.ফেনীর দাগনভূইয়ায় একজন কওমি শিক্ষক একটি নয় বছরের ছেলেকে বলাৎকার করে বহু বছর ধরে। ঐশী শাস্তির ভয় দেখিয়ে সে শিশুটির মুখ বন্ধ রাখে।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের প্রথম দিকে, সারা দেশে কয়েক ডজন মাদ্রাসা শিক্ষক এবং প্রিন্সিপাল গ্রেপ্তার হয়েছে। এসব মামলায় তাদের ব্যাখ্যা কি ছিল? ইসলামিস্টরা দল বেঁধে দেশে বিদেশে বলেছে শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত হিংসার কারণে ওলামাদের ওপর নির্যাতন করছে।
ওদিকে বলাৎকার ও ধর্ষণের শিকার শিশুদের সংখ্যা ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে। বেশিরভাগ বেঁচে থাকা শিশুর জীবন অদৃশ্য থেকে গেছে—ভয়, লজ্জা এবং পবিত্র পোশাকের নিচে চাপা পড়ে গেছে তাদের ট্রমা আক্রান্ত জীবন।
এতসব অপকর্মের মধ্যে একটি মেয়ের ঘটনা গোটা দেশের মানুষের কলিজায় দাগা দিয়েছিল। মেয়েটির নাম নুসরাত জাহান রাফি। মাত্র ষোল বছর বয়সে ২০১৯ সালে তার প্রিন্সিপালের যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রতিবাদে পুলিশে যাওয়ার কারণে তাকে তার মাদ্রাসায় তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।
৯. দুঃখের বিষয় যে তারপরও ইসলামিক শিক্ষায়তনে ধর্ষন ও বলাৎকারের এবং মৌলবীদের নারী বিষয়ক বয়ান ও ভয়ঙ্কর সংস্কৃতির ভয়াবহতা ধর্মীয় রাজনৈতিক (নেতা নয়) অভিনেতাদের নীরবতাকে নাড়া দিতে ব্যর্থ হয়।
ব্যার্থতার কারণ অবশ্য কারুরই অজ্ঞাত নয়। প্রতিদিন ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত গণমাধ্যমের ইসলাম ডেস্ক থেকে যে সব হাদীস ও কুরানের উপদেশ প্রচার হয় সে সবে চোখ বুলান। প্রায়শঃই চোখে পড়বে, “হজরত আবু হুরায়রা রাঃ বর্ণনা করেছেন-
لا يَستُرُ عبدٌ عبدًا في الدنيا إلا سَتَره الله يوم القيامة
‘দুনিয়াতে যদি কোনো বান্দা অপর কোনো বান্দার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে তবে কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাআলা ওই বান্দার দোষ-ত্রটি গোপন রাখবেন।’ (মুসলিম)
উদাহরণ স্বরূপ সময় নিউজের এ অনলাইন খবরটি দেখুন:
“হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত যে নবী সা. বলেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো বান্দার দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। (মুসলিম ২৫১০, আহমদ ২৭৪৮৪, ৮৯৯৫)
রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা মুসলমানদের দোষ-ত্রুটি, ভুলভ্রান্তি খুঁজে বের করো না। যে ব্যক্তি অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায় ও প্রকাশ করে দেয়, স্বয়ং আল্লাহ তার দোষ প্রকাশ করে দেন। আর আল্লাহ যার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করেন তাকে নিজের বাড়িতেই লাঞ্ছিত করেন। (আবু দাউদ ৪৮৮০) ”
(সময় নিউজ, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪)
জামায়াতের মোটো হচ্ছে, “সুন্নাহই ইসলাম।” নবীর পদাঙ্ক হুবহু অনুকরণ করে চলা-ই সুন্নাহ। সুতরাং নবী যখন দোষ প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন, কেউ বলাৎকার করে শিশু মেরে ফেললেও তা স্বীকার না করাই জামায়াতের নিয়ম।
১০. জামায়াত ও তার ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত মুমীন ভাইদের নারী ও শিশু নির্যাতন এবং এ বিষয়ে গোটা মোল্লা সমাজের অটুট নীরবতা পালনের সূত্র যে এজাতীয় হাদীস, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
পুরুষদের যৌন হাহাকার মেটানোর উদ্দেশ্যে নারী সদস্যদের ব্যবহারের নির্দেশ প্রমাণ করে যে জামায়াত বাস্তবে গণতান্ত্রিক সমাজের সামাজিক রীতিনীতি ও রাষ্ট্রীয় আইনের পথে এ সব সমস্যা সমাধানকে সঠিক মনে করে না। এটা গণতান্ত্রিক সমাজে তাদের দলীয় কার্যক্রম চালনার চরম ব্যর্থতাকেই প্রকাশ করে। এ সত্য আরও প্রকাশ করে যে, এ ধরণের বিকল্প উদ্ভট সংস্কৃতি—যা গণতন্ত্র, দেশীয় আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বিচারে অপরাধ— সেসব অপরাধকে জামায়াত দায়মুক্তি দিয়ে থাকে।
এভাবে গণতান্ত্রিক বিধি-বিধানকে অমান্য ও অসম্মান করে জামায়াত নিজস্ব দলীয় বিধান দেশে চালু রেখেছে।
১১. এটি স্মর্তব্য যে, বাংলাদেশে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষা নির্দেশিকা অমান্য করে কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজস্ব নিয়ম নীতি অনুযায়ী চলে। তারা গণতান্ত্রিক দেশের আইন ও রীতিনীতির তোয়াক্কা করে না।
সুতরাং যেমন জামায়াত দলটি একাত্তুরের গণহত্যার অপরাধীদের অভয়াশ্রম হয়ে আছে ১৯৭১ থেকেই, তেমনি মাদ্রাসাগুলোর অভ্যন্তর জগত শিশু-ও বালক- বালিকা শিকারীদের নিরাপদ আশ্রয় করে রাখা হয়েছে। জামায়াত কোনো ধর্মীয় দল নয়, এটি এক প্রাচীন কাল্ট যা নেতাদের প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ম তৈরী করে ও সদস্যদের ধর্মের নামে তা পালনে বাধ্য করে।
পর্দার আড়ালে, জামায়াত শরিয়া আইনের চরমপন্থী রক্ষক। ততদিন তারা তাদের আসল চেহারা ও রীতিনীতি গোপন রেখেছে যতদিন ক্ষমতা-কেন্দ্র হতে দূরে ছিল। ২০২৫ সালে তাদের কেন্দ্রীয় মিত্র বিএনপি ছাড়াই জামায়াত ক্ষমতায় বসতে চেয়েছে। সুতরাং এই ব্যবস্থায় অনেক বেশি সংখ্যক অল্প বয়সী ধর্ষণের শিকার মেয়েকে এখন সমাজে ধর্ষকের সাথে বিয়ে দিয়ে ইনডেমনিটি দেয়া হচ্ছে, এ আর অবাক হবার মতো খবর নয়। ফলে রেটিং বাড়ার মতো রগরগে না হলে, এসব খবর আর পত্রিকায় ছাপা হয় না।
১২. জামায়াতের অপরাধের প্রভাব গভীর—ভাগাভাগি নেতৃত্ব, তহবিল পাইপলাইন, এবং কওমি এবং সুন্নি নেটওয়ার্ক জুড়ে আদর্শিক সমন্বয়ের মাধ্যমে তা দেশ ও দেশের বাইরে বিস্তৃত।
নারীর প্রতি নির্যাতনের বিরুদ্ধে দলটির প্রতিক্রিয়ায় নিন্দামন্দ দেখবেন না আপনারা। অস্বীকার, বিভ্রান্তি ছড়ানো বা হিরণ্ময় নীরবতা পালন পর্যবেক্ষণ করলে তাদের শরিয়ার সংস্কৃতি বোঝা যায়।
শুধুমাত্র একবার—২০২৫ সালের মাগুরা শিশু ধর্ষণ মামলায়—হঠাৎ জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান আচমকা একটি শিশুর ধর্ষণে উদ্বেগ প্রকাশ করে ও দ্রুত শাস্তির দাবি জানায়। বোঝাই যায় তার ঐ দিনের ক্ষোভ প্রদর্শন ছিল রাজনৈতিকভাবে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নীতিপরায়ণ দল হিসেবে জামায়াতকে প্রদর্শন করা।
কিন্তু হিন্দুদের জন্য ‘জিজিয়াকর’ সমর্থনে, জুলাইতে নিহত হিন্দুদের শহীদ বলতে না চাওয়ার রীতিতে, তাদের রাজনৈতিক পার্টনারদের মুখে নয় বছরের শিশুর বিবাহের সমর্থন ও প্রচারে, আমীরের এ মুখোশ বারবার খসে পড়তে দেখা যায়।
দশকের পর দশক দলটির সদস্যদের হাতে সংগঠিত হত্যাকাণ্ড, নারী ও শিশুদের যৌন নির্যাতন, সভ্য সমাজের নীতি-গর্হিত আচরণ, গণতান্ত্রিক আইন-বিরোধীতা দলীয় বিচারে অপ্রয়োজনীয় ইস্যু হিসেবে গণ্য হয়েছে।
১৩. এখন জামায়াত যদি তার নারী সদস্যদের বলে, যে তাদের উচিত তাদের যৌনতা-বঞ্চিত ইসলামী ভাইদের সেবায় আত্মনিয়োগ করা উচিত, তারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করবে। প্রমাণ করে দেবে মুতা-আহ হারাম নয়। এটা সাময়িক বা অস্থায়ী বিবাহ সুতরাং হালাল। কিম্বা অল্পবয়সীদের সাথে যৌনকর্ম করতে গিয়ে ধরা পড়লে তারা বিবাহের ছল করবে জনগণকে ধোঁকা দিতে।
অথচ ’মুত-আহ’ স্রেফ বিশেষ সময়ে পুরুষের যৌন ক্ষুধা মেটাবার উদ্দেশ্যে করা একটি যৌনচুক্তি মাত্র, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু অর্থের বিনিময়ে করা হয়ে থাকে। অর্থ বিনিময়ের পর তা শেষ হয়ে যায়।
এ কথা কানে গেলেই জামায়াত — মোল্লা মৌলবীদের অসম্মান করা হচ্ছে— বলে পুণরায় ভিক্টিম ভূমিকায় নেমে পড়বে। গত দুই বছর ধরে তো মব লেলিয়ে দিচ্ছে। ‘শাতিমে রসূল’ ট্যাগিয়ে ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিতে মাদ্রাসার ছাত্রদের ডেকে আনছে শিবির। এ এক বিরাট অপরাধী চক্র যার হাতে বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষকে জিম্মি হবার রাস্তা পরিস্কার করে দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান মুহাম্মদ ইউনুস।
অপরদিকে দলের বিশ্বাসী নারীরা তাদের নেতার নির্দেশ অমান্য করতে পারে না। জামাত ইসলামের কথা বলে রেজিমেন্টের মতো দল চালায়। মধ্য পর্যায়ের নারী নেত্রীরা দলে জনপ্রিয় হতে তাদের বয়সে ছোট বোনদেরই নানা উপদেশ দিয়ে ‘মুতা আহ’ বিবাহে বারবার রাজী করায়।
পাঠক, এই ব্যাবস্থাটাকে পতিতাবৃত্তি ছাড়া আর কি নামে অভিহিত করা যায়?
১৪.মাদ্রাসাগুলোর অভ্যন্তরে চাকরীরত অভিযুক্তরা বরাবরই ছিল। শিবিরের লাইন অফ কমাণ্ডে বরাবর বলাৎকারের শিকার ছেলেদের কাহিনী উঠে এসেছে। জামায়াত চোখ ফিরিয়ে রেখেছে। এই নীরবতা নিষ্ক্রিয় থাকা নয়। এটিই সদস্যদের ধরে রাখার রাজনৈতিক কৌশলও বটে।
জামায়াত-শিবির, ‘১৯৭১ সালের গণহত্যাকারীরা দুধে ধোওয়া ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি’- এই মিথ্যে প্রচারে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছে। তারা গণহত্যাকে রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে পুনর্নির্মাণ করছে বায়াত্তর সাল থেকে। ২০২৪ সালে তাদের পরবর্তি জেনারেশনের শিবির সদস্য ও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গী সাথী এনসিপি বা ইনক্বিলাব পুণরায় বলে চলেছে, একাত্তরে পাক-ভারত যুদ্ধ হয়েছে মাত্র। কিম্বা ভারতের সাথে মিলে পাকিস্তান ভাগ করা হয়েছে। একাত্তরে জামায়াত কোনও গণহত্যা করে নি।
জামায়াত যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সমর্থন করেছিল, এর ছাত্র শাখা, ইসলামী ছাত্র সংঘ (বর্তমানে শিবির) মিলিশিয়া হিসেবে কাজ করেছিল, গণহত্যা সংগঠিত করতে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য নারীদের যৌন দাস হিসেবে বাধ্য করতে সহায়তা করেছিল, এ সবই বিশ্বের গণমাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু এই সব মিথ্যে ছড়িয়ে নানা প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস তাদের থামে নি।
১৩. ইসলামী রাষ্ট্র আন্দোলনের সদস্যদের বড়ো বড়ো অপরাধ অস্বীকার জামায়াতের বিশ্বব্যাপী প্রচারণার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এটা তাদের নৈতিক অবস্থানেরও স্মারক।
সুতরাং কি ধর্ষক, কি বলাৎকারের অপরাধ, কি গণহত্যার অপরাধ, সব অপরাধীর বেলায় অস্বীকার ও নিরবতা তাদের ধর্ম। এ সব বিষয়ে প্রশ্ন তুললে তারা ধর্মীয় বয়ান হাজির করে নিজেদের নির্দোষ দাবী করে তারা।
জামায়াতের নেতা আবুল কালাম আজাদ এবং আজহারুল ইসলাম গণহত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। ২০২৫ সালে, আজাদ—যিনি এখনও পলাতক—মুক্তির দাবি জানান। কেন নয়? এখন তার দল মুহাম্মদ ইউনুসের এনসিপি ও মবের সহায়তায় দেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তার শাসনামলে ৭০০ জনেরও বেশি দণ্ডিত জিহাদি এবং পরিচিত অপরাধী মুক্তি পেয়েছে।
অপরদিকে জামায়াতের আরেক সদস্য আজহার এখন মুক্ত হয়ে, যারা তাকে গণহত্যার প্রমাণিত অপরাধে বিচারের মুখোমুখি করেছিল, তাদেরই বিরুদ্ধে বিচারের আহ্বান জানাচ্ছে।
এই সব শঠতা জামায়াতের রাজনীতিতে পুণরাবৃত্ত হয়ে চলেছে শত বছরের কাছাকাছি হলো। এ সব রীতিনীতির কারণে জামায়াতের মওদুদীকে মুনাফেক বলে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
চলুন, যাওয়া যাক চিঠির বক্তব্যে।
প্রথমত, চিঠিটি সতর্ক করেছে যে “ধর্ষণ এবং বলাৎকারের খবর” শত্রু মিডিয়াকে ক্ষমতায়িত করবে। চিঠির ভাষ্য হলো, এই অপকর্মগুলো ভুল নয়, বরং এসব রিপোর্ট করা ভুল। জামায়াত নিয়ে কিছু বলাই ষড়যন্ত্র। দলটি বাবে তারা সব সমালোচনার উর্ধে। অনেক সময় তারা এও দাবী করে একজন মৌলবীর যৌন-সহিংসতার খবর প্রচার ইসলামের বদনাম রটানো মাত্র। সুতরায় জামায়াতের সমালোচনা ও ইসলাম বিরোধী কাজ। অর্থাৎ জামায়াত ও ইসরাম অভিন্ন হিসেবে তারা দাবী করে।
দ্বিতীয়ত, খেয়াল করুন নির্দেশটিতে দায়মুক্তির কথাও রয়েছে।
জামায়াতের ইতিহাস তেকে সাক্ষ্য দেয় এমনকি দোষী সাব্যস্ত হওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনকারীরাও এ দলের বিভিন্ন দলীয় পদে আসীন থেকেছে—প্রায়শঃই তাদের পুণরায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, কখনোই আইনের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত কোনও ব্যক্তি দলের পদ থেকে অপসারিত হয়নি।
তৃতীয়ত, জামায়াতের নারী নিপড়িনমূলক এসব নিয়ম নিয়ে যে ‘নীরবতা’ তা জামায়াতের কাছে স্বার্থের সূত্রে বাঁধা কেউ কেউ ’নিরপেক্ষ’ অবস্থান রূপে দেখাতে চেষ্টা করেছে, কিন্ত এটি কোনও নিরপেক্ষ অবস্থান নয়। জামায়াতীরা যে অপরাধগুলো গোপন করে, সে অপরাধগুলো যত নিন্দনীয়, জামায়াতের এই গোপন নিয়মও ততটাই নিন্দনীয় ।
৭. আদর্শিক চরমপন্থা ও কূটনৈতিক বিভ্রম
১৪. জামায়াতের রাজনীতি নিজেদের বড়োবড়ো অপরাধের দায়মুক্তির রাজনীতি। এ রাজনীতি ও তার চরমপন্থী আদর্শ -সংস্কৃতি ঐতিহাসিকভাবে এবং কাঠামোগত প্রক্রিয়ায় অনুশীলিত হয়ে আসছে। অতীত ও বর্তমানের অপরাধ অস্বীকারের নীতি ও আদর্শ দলটির সক্রিয় রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব দ্বারা সুরক্ষিত।
মানুষের অধিকারের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে তারা আনুগত্যের নিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলে নিজেদের চারপাশে নৈতিকতারএকটা পুণঃর্বিন্যাস ঘটিয়েছে। মাদ্রাসার কাঠামোয় নারী ও শিশুদের নির্যাতন থেকে যুদ্ধকালীন নৃশংসতা পর্যন্ত, জামায়াতের অবস্থান তাদের রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের জন্য এক ধরণের ‘প্রতিরক্ষামূলক অস্বচ্ছ বাতাবরণ তৈরী’ করেছে। তারা দলীয় অভ্যন্তরণি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে ধর্মের অসভ্য সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিয়ে । অপরদিকে সমাজের দশজনের সামনে নিজেদের বৈধতা বজায় রাখতে সাংগঠনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তি নারীকে শোষণ, দমন ও নিপীড়ন করছে।
দলটি তার রাজনীতি সংযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য অপরাধ প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও কারু জবাবদিহিতা করে নি। অপরাধীরা এর নেটওয়ার্কে জড়িত থাকে—প্রশ্নবিহীন, তদন্তবিহীন।
জামায়াত এমন এক সংস্কৃতি প্রচার করে, যাতে ধর্মীয় আত্মীয়তার ওপর মুসলমানদের আস্থা রাখতে বলা হয়, এবং এ বিষয়টিকে দেশের আইনি বাধ্যবাধকতার ওপর স্থান দেয়া হয়।
যেমনটি আগে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে জামায়াতের অপরাধ অস্বীকার ও অপরাধীর ইনডেমনিটির কাঠামো ১৯৭১ সাল থেকে আজকের দিন পর্যন্ত প্রসারিত।
এসব করে দলটি বাস্তবে যে কেবল অপরাধ প্রত্যাখ্যান করে তাই নয়—তারা প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে, এর আইনের শাসন, সংবিধানের বিধি-বিধান ও বাংরাদেশের জন্মের মৌলিক নীতিসমূহকে। এই দলটির তো এ দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার থাকার কথা নয়।
দার্শনিকতার বিচারে তাদের সংস্কার ইত্যাদি নিয়ে যেসব নৈতিক সবক শোনা গেছে, তা তাদের কর্মকাণ্ডে দেখা যায় না। যে কারণে ২০২৪ সালে যুদ্ধাপরাধীদের ইমেজ শহীদ হিসেবে পুনর্নির্মিত হয় এবং গণহত্যাকারীরা দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রশংসিত হয়।
তাদের নবীন প্রজন্মের মুমীনেরা পাকিস্তানের আদর্শিক শব্দভাণ্ডার পুণরুজ্জীবিত করে। মুক্তিযুদ্ধকে একটি দুঃখজনক বিভেদরূপে প্রচার করে। ২০২৪ সালের জুলাই কোটা প্রতিবাদের সময় তাই তাদের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী তরুণদের মুখে জামায়াত-শিবিরের কাহিনী শোনা যায়। এরা মুক্তিযুদ্ধকে অবৈধ দেখাবার চেষ্টা করে। শেখ মুজিবকে সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত নেতার স্থান দিতে তাদের আপত্তি পুণরায় উত্থাপন করে।
এ কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতিভ্রম নয়—এ হলো জামায়াতের পাকিস্তানভিত্তিক জাতীয় স্মৃতি পুনরুদ্ধারের প্রচারণা।
দেশের সার্বভৌম গণতান্ত্রিক পরিচয়ের ওপরে উঠে, নিজ দলীয় পরিচয়কে তারা আন্তর্জাতিক ইসলামীক আনুগত্যে উন্নীত করার জন্য লাগাতার লড়াই করছে নিজেরই জন্মভূমির জনগণের বিরুদ্ধে। সেখানে ৭১ এর মতোই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে, ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়েছে। হিন্দু, সেকুলার চিন্তাবিদ, এলজিবিটি, ও ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীগুলো যে তাদের থাবার নিচে থাকার মতো, এই দর্পিত মনোভাব আচার আচরণে ও কাজকর্মে দেখিয়ে চলেছে ।
১৫. গত কয়েক দশকে, যখন বৈশ্বিক মনোযোগ প্রায়শই পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের নির্যাতনের উপর কেন্দ্রীভূত ছিল, তখন বাংলাদেশের ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক সহায়তায় একটি গভীর ও অপ্রকাশিত সংকট তৈরি হচ্ছিল।
২০২৫ সালে যখন এ প্রতিবেদন লিখ হচ্ছিল তখন পুলিশের প্রতিবেদনগুলোতে ৫,৬০০টিরও বেশি শিশু ধর্ষণ দেখানো হয়েছে, যা ঘটেছে শত শত মাদ্রাসার ঘেরাটোপের মধ্যে। সাম্প্রতিক সময়ে এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে কিন্তু খবর হিসেবে চাপা হচ্ছে কমসংখ্যক অপরাধ। যেমন দেখা গেছে হামের ক্ষেত্রে হাজারের ওপর শিমমু নিহত হলেও খবরের কাগজে তার গোটা সংখ্যক পাওয়া যায় না। জেল হাজতে তিনশোর ওপর অওয়ামী লীগ সদস্য নিহত হলেও সরকারী হিসেবে তা পঞ্চাশের ও নিচে। বেশিরবাগ ক্ষেত্রে নিহতের আসল পরিচয় বলা হচ্ছে না।
দেশের সকল প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্কের ওপর জামায়াতের প্রভাব অপরাধীদের বিচার থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে। এভাবে ধর্মীয় পথ অবলম্বনকারীদের মারাত্মক অপরাধের দায়মুক্তির একটি পদ্ধতিগত সংস্কৃতি শক্তিশালী করে সমাজকে আর নিপীড়নের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এই অপারেশনাল যুক্তির সবচেয়ে উদ্বেগজনক সাম্প্রতিক উদাহরণ হল উল্লিখিত অভ্যন্তরীণ চিঠি যা পুরুষের যৌনতা ব্যবস্থাপনায় “মুত‘আহ” বিবাহ চালু করে। “মুত‘আহ” গ্রহণ জামায়াতের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব এবং দাসপ্রথা নিয়ন্ত্রণকে প্রতিফলিত করে। এই ব্যবস্থা নারীদেরকে পুুরষের ‘তৃপ্তির যন্ত্রে’ পরিণত করে, যৌন নির্যাতনকে পদ্ধতিগতভাবে ধর্মতাত্ত্বিক বৈধতা দান করে।
০২৪ এর জুলাইয়ের এর পর এর বাইরে কিছু এজেন্সি গড়ে উঠেছে যারা তালাকপ্রাপ্ত নারীদের ‘সিভি’ সংগ্রহ করে পরপুরুষের সঙ্গে এক বা একাধিক রাত কাটানোর, বা সহবাসের চুক্তি করিয়ে দিচ্ছে। একে তারা বলছে ‘ইসলামি সমাধান! একটি এজেন্সী সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েই এই ব্যাবসা শুরু করেছে।
৮. পশ্চিমাদের জামাত ই ইসলাম বিষয়ক বিভ্রম এবং কূটনৈতিক নিরবতা
১৬. কয়েক দশকেরও বেশি সময় ধরে, ওয়াশিংটন এই বিভ্রম আঁকড়ে আছে যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চরমপন্থী নয়, মডারেট রাজনৈতিক ইসলামের একটি ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করে। ২০১৩ সালে, কিছু বিদেশী এমনকি এটিকে “মডারেট ইসলামপন্থী দল” হিসেবে উল্লেখও করে। এ কথাটি এমন একটি লেবেল, যা এখন খারাপ গালি হিসেবেও পুরণো হয়ে এসেছে।
ভারতের প্রাক্তন হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মতো বিশেষজ্ঞরা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে কেবল ত্রুটিপূর্ণ নয়, বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেছেন যে এটি জামায়াতকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দেয়। কিন্তু জামায়াত এটি উপার্জন করেনি বা এটি অজর্নে কোনও অনুশীলনও করেনি। (ঢাকা ট্রিবিউন, ৮ নভেম্বর, ২০১৩)
কূটনৈতিক পাড়ার এ আচরণকে কি জনগণ ’কূটনৈতিক ভুল’ হিসেবে ধরবে? নিশ্চয়ই নয়। এ হলো একটি ’ভুল দলকে স্বীকৃতি’ প্রদানের কৌশল । এই পথ ধরে কূটনৈতিক সমাজ বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষকে এদের হাতে জিম্মি হতে দিয়েছে।
জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে “বিভাজন” ও অপ-রাজনীতির বয়ান-শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেছে। কিভাবে জামায়াত এর প্রকাশ ঘটায়?
পশ্চিমাদেশের প্রতিনিধিদের কাছে তারা নিজেদের এক ধরণের নূরাণী ভিক্টিম চেহারা উপস্থাপন করে। ওদিকে দেখুন, দেশের ভেতরে আইসিসের সপ্তদশ শতকীয় জিজিয়া প্রচার করছে বাংলাদেশের দুই কোটি হিন্দুর জন্য। বন্ধ দরজার পিছনে, যৌন-সন্ত্রাসের মতো বিচারিক অপরাধকে ফিল্টার করছে মুতা-আহ বিবাহের হালালি দিয়ে, এবং আনুগত্যের মাধ্যমে পতিতাবৃত্তিকে পবিত্র করে তুলে নারীর যৌনতাকে শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ করছে দলের স্বার্থে।
চক্রবর্তী জামায়াতের প্রসঙ্গে আরও একটি উদ্বেগজনক ভূ-রাজনীতির বিষয় উল্লেখ করেছেন: যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি এবং পাকিস্তানের স্বার্থের সাথে ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে সংমিশ্রণ শুরু থেকেই বাংলাদেশের জন্য বিশাল সমস্যা তৈরী করে রেখেছে। জামায়াত এই অক্ষকে কাজে লাগায়। বাংলাদেশী ধর্মীয় রাজনীতির পাণ্ডাদের নিরীহ পরিচয় রপ্তানি করে তারা এবং মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক ও অস্বচ্ছ ধর্মীয় বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে সমাজের শ্রেণীবিন্যাসকে গভীর বিভ্রান্তিতে রাখে।
বাস্তবে জামায়াতের রাজনৈতিক ইসলামী নিয়ম-কানুন গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের অস্বীকারের উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং ইসলামের জন্য যৌন-দাসত্ব ও গণহত্যাকে অপরাদ মনে করে না।
“ধর্মীয় পরিচয়” হিসেবে জামায়াত যে ধারণা বাজারজাত করে তা প্রায়শঃই আড়াল মাত্র: এই আড়াল মেয়েশিশু, বালক -বালিকা ও নারী শিকারীদের রক্ষা করে, পিউর ইসলামকে ব্যাখ্যা করে নারীকে মুসলিম পুরুষের সাথে দুই ঘন্টার জন্যও বিছানায় যেতে রাজী করায় ও সে ঘটনাকে পবিত্র লেবাস দেয়। এভাবে দলটি মানবাধিকার লঙ্গনের যাবতীয় অপরাধীদের জবাবদিহিতার বিষয়টিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখায়।
মাদ্রাসার মোল্লাদের যৌন কেলেঙ্কারি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুত‘আহ বিবাহের নির্দেশ দেওয়া চিঠিটি এই অপারেশনাল যুক্তিকে স্পষ্ট করে। দলটি যে নারীদের শরীর এবং স্বাধীনতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র রক্ষা করে, তা বিচ্ছিন্ন নৈতিক ত্রুটি নয় বরং রাজনৈতিক ধর্মের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রমাণ, যেখানে দলের প্রতি আনুগত্য সমস্ত নৈতিক সীমাকে লঙ্ঘন করতে আদেশ দেয়।
জামায়াতের অপরাধ অস্বীকার প্রবণতা কেবল প্রতিক্রিয়াশীল নয়—এটিই তার রাজনীতির ভিত্তি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের প্রেস উইংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত শফিকুল আলমের একটি সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্ট জামায়াতের নেতার “শৃঙ্ক্ষলা এবং সততা”কে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ চরম পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্ক্ষলাকে কীভাবে জামায়াত নৈতিক গুণ হিসেবে উপস্থাপন করে মানুষকে উল্টো বোঝায় এ পোস্ট তার উদাহরণ।
সাধারণ মানুষ জানেই না যে তাদের এই শৃঙ্ক্ষলার নিচে থাকা রাজনৈতিক নীতি গুলো ক্ষয়কারী, মানবাধিকার বিরোধী ও দেশবিরোধী। কেননা দলটির উদ্দেশ্য সাংবিধানিক পরিচয়কে আন্তর্জাতিক আনুগত্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করে ইসলামী এমপায়ার পুনরুদ্ধারে বিশ্ব মুসলিম ব্রদাহারহুডের সাথে সমন্বিত প্রয়াস গ্রহণ। জামায়াত কোনও স্থাণীয় দল নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক ইসলামিক আন্দোলন।
জামায়াত ইসলামের মুসলিম ভ্রাতৃত্বের জন্য কান্নাকাটি জনগণকে এই বার্তা দেয় যে তার কাছে পাকিস্তানের ১৯৭১ এর যুদ্ধে পরাজয়ের দুঃখ বাংলাদেশের জন্মের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার আনুগত্য সংবিধান নয়, জাতির কাছে নয়, তাদের সালাফিস্ট এমপায়ার গঠনের মতবাদে।
জামায়াত যে বাংলাদেশকে প্রত্যাখ্যান করছে তা শুধু ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা যখনই দেখে বিচারালয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি তাদের অপরাধকে পাবলিক করার হুমকি দিচ্ছে, তখনই প্রত্যাখ্যানের রাজনীতিতে নেমে পড়ে। পুণরায় তারা ব্র্যাণ্ডিং করে। পুণরায় প্যাকেজিং হয়—কিন্তু তার নৈতিক অবস্থান সব সময় ’প্রত্যাখ্যান’ শব্দটির মধ্যেই থাকে।
৯. নৈতিক প্রদর্শন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি
১৯৭১ সালের ছাইভন্মে পুড়ে যাওয়া জামায়াত ১৯৭৫ এর রক্তে ফের প্রাণ পেয়ে পিরে আসে। ২০২৫ সালের ষড়যন্ত্রমূলক সামাজিক, রাজনৈতিক উপপ্লব পর্যন্ত, তাদের পান্ডুলিপি খুব কমই বদলেছে। শিকারদের নীরব করে দেয়া, শিকারীদের সুরক্ষিত করা, বিচারকে বিশ্বাসের উপর আক্রমণ হিসেবে প্রচারণা এবং যে সরকার তাদের বিচারের মুখোমুখি করেছিল তাকে ‘তাগুতি এবং ফ্যাসিস্ট সরকার’ হিসেবে দেশে দেশে প্রচার, নিয়মিত চলেছে।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে, আমীর শফিকুর রহমান বলেছেন: “আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে (২০২৪ এর) আন্দোলনের কোনো সমন্বয়কারী জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির সাথে যুক্ত কিনা।” তার এই দাবি একটা জ্বলজ্যান্ত মিথ্যা। ১৫৮ জন সমন্বয়কারীর মধ্যে ১৩৮ জন শিবিরের। শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা সাদেক কায়েম ভিডিওতে তাদের আন্দোলনে জড়িত থাকার কথা গর্ব ভরে বলে বেড়াচ্ছে। আরো কয়েকজন ৫০০ পুলিশ অফিসার হত্যার পরিকল্পনা, মেট্রো রেল পোড়ানোর পরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণ সেশন আয়োজনের দাবি করেছে। আমীর সত্যকে উর্টে দিয়ে কথা বলেন বিদেশী গণমাধ্যমে। এখন ২০২৬ এ এসে দেখা যাচ্ছে গত দুই বছর তারা এককভাবে নিজেদের ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্বের বড়াই করে চলেছে।
ধর্মনিরপেক্ষ এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর বিপরীতে, জামায়াত মাদ্রাসা বা এর সহযোগীদের মধ্যে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে কোনো নীতি জারি করেনি। যৌন নির্যাতনের মামলায় তাদের প্রতিক্রিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচ্যুতি প্রকাশ করে: রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বা পশ্চিমা নৈতিক ক্ষয়কে দোষ দেওয়া হয়। নিজেদের তারা ষড়যন্ত্রের শিকার হিসেবে চিত্রিত করে—নৈতিক দায়িত্বের বাহক রূপে নয়।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা এ ধরণের আচরণকে প্রাতিষ্ঠানিক দখল হিসেবে বর্ণনা করে। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাঠামোটির উদ্দেশ্যই হচ্ছে শিকারীদের রক্ষা এবং জবাবদিহিতা দমন।
দমন, সংশোধন, এবং ধার্মিক চোহার দেখিয়ে অপরাধ অস্বীকার—একটি রাজনৈতিক আর্কিটেক্ট এর রূপ। ঐশ্বরিক ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির জন্য ব্যবহার করেই এই আর্কিটেকচারাল সংস্কৃতি টিকে তাকে।
ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার কোনো সাংস্কৃতিক আক্রমণ নয়; এটি একটি ’গণতান্ত্রিক আবশ্যকীয় কাজ‘। শেখ হাসিনার ধর্মনিরপেক্ষ সরকার সেই গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করেছিল। একই সাথে সে সরকার উদার হতেও চেষ্টা করেছিল।
জামায়াত উত্তরে, ১৯৭১ সালের সাথে সম্মিলনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, পদ্ধতিগত নারী-শিশু নির্যাতনে নীরবতা পালন করেছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে তার মিথ্যে বয়ান দিয়ে ম্যানিপুলেশন করে বাংলাদেশের নৈতিক এবং গণতান্ত্রিক ভিত্তির বিরুদ্ধে কৌশলগত আক্রমণ গোপনে চালিয়ে গেছে।
তারা যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে তা কেবল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্মৃতি নয়, বরং ১৭৫ মিলিয়ন মানুষের ভবিষ্যত। এ ভবিষ্যত ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষ শাসননীতির মধ্যে নিহিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সে নীতির সম্প্রসারণের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক এবং বহুত্ববাদী পথেরও দিশা আছে।
জাহানারা নুরী




